কুষ্টিয়া প্রতিনিধি | মো. মুনজুরুল ইসলাম
কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন, তিন বছরের শিশু সন্তান স্বর্ণশীষ দত্ত এবং শ্বশুর আকরাম হোসেনের মরদেহ আজ শনিবার দেশে ফিরছে। চিকিৎসার আশায় কলকাতায় যাওয়া একই পরিবারের চারজনের এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে কুষ্টিয়াজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেবাশীষ দত্ত ও তাঁর শিশু সন্তান স্বর্ণশীষের সৎকার এবং স্ত্রী আফসানা শারমীন ও শ্বশুর আকরাম হোসেনের দাফন পৃথক ধর্মীয় রীতিতে সম্পন্ন হবে। শনিবার রাত ৮টার দিকে কুষ্টিয়া মহাশ্মশানে বাবা ও ছেলের সৎকারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আফসানা শারমীন ও তাঁর বাবা আকরাম হোসেনের মরদেহ প্রথমে দেবাশীষের বাড়ির সামনে নেওয়া হবে। পরে কুষ্টিয়া শহরের থানাপাড়ায় আফসানার বাবার বাড়িতে নেওয়ার পর তাঁদের কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে মুসলিম রীতি অনুযায়ী দাফন করা হবে। বাদ এশা দাফনের প্রস্তুতি থাকলেও মরদেহ দেশে পৌঁছানোর সময়ের ওপর চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ভর করবে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দেবাশীষের বাবা দিলীপ দত্ত ও পরিবারের স্বজনরা।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় নয় বছর আগে আফসানা শারমীনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত। ভিন্ন ধর্মের হলেও ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে তাঁদের সংসার। দুই সন্তান মহিমা ও স্বর্ণশীষকে ঘিরেই ছিল তাঁদের ছোট্ট সুখের পৃথিবী। কিন্তু কলকাতার ভয়াবহ আগুন মুহূর্তেই সেই সংসারে নামিয়ে আনে অপূরণীয় শোক।
চলতি মাসের ৩ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসা থেকে স্ত্রী আফসানা শারমীন ও ছোট ছেলে স্বর্ণশীষকে সঙ্গে নিয়ে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যান দেবাশীষ। কয়েকদিন পর তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন আফসানার বাবা আকরাম হোসেন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে দেশে ফেরার কথা ছিল তাঁদের। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে জীবিত নয়, চারজনই ফিরছেন কফিনবন্দি হয়ে।
এদিকে কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইনে গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশি ও দুই ভারতীয়সহ মোট নয়জনের মৃত্যু হয়। বৃহস্পতিবার কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিহতদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। শুক্রবার রাতে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন, তিন বছরের সন্তান স্বর্ণশীষ দত্ত, শ্বশুর আকরাম হোসেন এবং সাভারের আমিনবাজারের আহমেদ বাবুর মরদেহ যশোরের বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে দেশে আনা হচ্ছে। সাতক্ষীরার আলিমুজ্জামান সাজুর মরদেহ ভোমরা সীমান্ত দিয়ে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর সাতক্ষীরার রেবতি সরকারের মরদেহ পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভারতে থাকা এক আত্মীয়ের কাছে রেখে সেখানেই শেষকৃত্য সম্পন্ন করার কথা রয়েছে।
শুক্রবার রাতেই নিহতদের মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। শনিবার সকালে পাসপোর্ট বাতিলের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টা থেকে ২টার মধ্যে কলকাতা থেকে পেট্রাপোল সীমান্তের উদ্দেশে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স রওনা হওয়ার কথা ছিল। তিনটি অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহগুলো সীমান্তে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাম্বুলেন্সচালক সাব্বির হোসেন। শুক্রবার রাতে সব প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো কলকাতার পিস ওয়ার্ল্ডের হিমাগারে রাখা হয়েছিল।
কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার মোহাম্মদ খালেদ জানিয়েছেন, সরকারি খরচে নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কাগজপত্রের কিছু জটিলতার কারণে শুক্রবার মরদেহ পাঠানো সম্ভব না হলেও রাতের মধ্যেই প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে শনিবার সড়কপথে মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
এদিকে দেবাশীষের কন্যা মহিমার ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগের মধ্যে পাশে দাঁড়িয়েছে এডুকেয়ার স্কুল কর্তৃপক্ষ। নিহত পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে তাঁর পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
একটি পরিবারের চার সদস্যের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক সমাজ, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোক বিরাজ করছে। স্বজনদের অপেক্ষার অবসান ঘটলেও আজ কুষ্টিয়ায় ফিরবে চারটি কফিন—যার সঙ্গে ফিরবে একসঙ্গে গড়ে ওঠা একটি পরিবারের অসহনীয় শূন্যতা, স্মৃতি আর অশ্রুসিক্ত বিদায়ের গল্প।
| ফজর | ৫.২১ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৩.৪৭ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৫.২৬ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৬.৪৪ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১২.৩০ মিনিট দুপুর |