কুষ্টিয়া প্রতিনিধি | মো. মুনজুরুল ইসলাম
পদ্মার বুকজুড়ে তখনও ঢেউয়ের উন্মত্ততা। তীরের মাটি যেন প্রতিমুহূর্তে কেঁপে উঠছে। চোখের সামনে একটু একটু করে নদীর গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা ফসলের মাঠ। কোথাও পাটখেত, কোথাও আম-কাঁঠালের বাগান—সবকিছুই যেন মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হচ্ছে স্মৃতিতে। নদীতীরে দাঁড়িয়ে অসহায় চোখে সেই দৃশ্য দেখছেন কৃষকেরা। কারও হারিয়েছে কয়েক বিঘা, কারও ২০ বিঘার বেশি। কারও আবার শেষ সম্বলটুকুও বিলীন হয়েছে সর্বনাশা পদ্মায়।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের ভূরকা-হাটখোলা, কোলদিয়াড়, মাজদিয়াড় ও ফয়জুল্লাহপুর এলাকায় গত দুই সপ্তাহ ধরে পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে শত শত বিঘা আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কোলদিয়াড় থেকে পাশের ভেড়ামারা উপজেলার জুনিয়াদহ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় গত ১৫ থেকে ২০ দিনে শতাধিক একরেরও বেশি কৃষিজমি নদীগর্ভে চলে গেছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে আরও শত শত বিঘা জমি, বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, মসজিদসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে পদ্মার পাশাপাশি মাথাভাঙ্গা ও হিসনা নদীর পানিও বাড়ছে। এতে নদীর স্রোত ও ঢেউয়ের তীব্রতা বেড়ে ভাঙন আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। নদীপাড়ের মানুষের চোখে এখন একটাই আতঙ্ক—ফসলি জমির পর এবার কি বসতভিটাটুকুও পদ্মার পেটে চলে যাবে?
কোলদিয়াড় গ্রামের কৃষক ইব্রাহিম আলী সেই আতঙ্কেরই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। কয়েক দফা ভাঙনে এরই মধ্যে প্রায় ১০ বিঘা জমি হারিয়েছেন তিনি। শেষ সম্বল হিসেবে পড়ে ছিল মাত্র ১০ শতকের মতো জমি। গত কয়েক দিনের ভাঙনে সেটুকুও নদীতে বিলীন হয়েছে। এখন আর হারানোর মতো কিছুই নেই তাঁর।
আফসোসের সুরে ইব্রাহিম আলী বলেন, ‘একসময় আমার অনেক জমি ছিল। নদী সব নিয়ে গেছে। শেষ যে জমিটুকু ছিল, সেটিও গেল। এখন আমি পুরোপুরি নিঃস্ব।’
একই গ্রামের রফিকুল ইসলামেরও একই দশা। তাঁর প্রায় সাত বিঘা জমি ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে গত দুই সপ্তাহেই হারিয়েছেন প্রায় এক বিঘা। এখন কেবল বসতবাড়িটুকু রয়েছে। সেটিও ভাঙনের ঝুঁকিতে।
ভূরকাপাড়া গ্রামের মহাবুল ইসলাম নদীভাঙনে হারিয়েছেন ২০ বিঘারও বেশি জমি। তাঁর ভাষায়, ‘এখন শুধু মাথা গোঁজার জন্য বাড়িটুকু আছে। ভাঙন যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে এটিও হয়তো আর বেশিদিন থাকবে না।’
নদীতীরে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মর্জিনা খাতুন বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে ১৪ বিঘা জমি করেছিলাম। পদ্মা সব শেষ করে দিয়েছে। ঘরে কর্মক্ষম স্বামী ও তিন সন্তান। পাঁচজনের সংসার। এখন অভাবের মধ্যে দিন কাটছে। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি—অন্তত বসতবাড়িটুকু যেন রক্ষা করা হয়।’
মর্জিনা খাতুনের মতোই নদীতীরে এসে অসহায় আকুতি জানাচ্ছিলেন বিউটি খাতুন, শুকরুন্নেসা, তবারক হোসেন ও আব্দুর রশিদসহ আরও অনেকে। তাঁদের কারও ২৫ বিঘা, কারও ১০ বিঘা, আবার কারও চার-পাঁচ বিঘা জমি নদীতে বিলীন হয়েছে।
ভূরকাপাড়া গ্রামের কৃষক আতর আলী বলেন, ‘প্রতিদিন চোখের সামনে জমি নদীতে চলে যাচ্ছে। শত শত কৃষক আজ নিঃস্ব। আমরা সাময়িকভাবে জিও ব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা চাই না শুধু; আমরা চাই স্থায়ী সমাধান। সিমেন্টের ব্লক দিয়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।’
স্থানীয় জাকির হোসেন জানান, ভূরকাপাড়ার একটি ছোট অংশে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কারণে সেখানে ভাঙনের তীব্রতা কিছুটা কমেছে। কিন্তু কোলদিয়াড়, হাটখোলাপাড়া হয়ে রায়টা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও অরক্ষিত। প্রতিদিনই নতুন করে জমি নদীতে বিলীন হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনসহ ঝুঁকিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা
পদ্মার তীব্র ভাঙন শুধু কৃষকের জমি কেড়ে নিচ্ছে না, একই সঙ্গে জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক অবকাঠামোকেও ঠেলে দিচ্ছে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে।
নদীভাঙনের সীমানা থেকে মাত্র প্রায় ৫০০ ফুট দূরে রয়েছে ভারত থেকে আসা ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। ভাঙন অব্যাহত থাকলে সঞ্চালন টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এ ছাড়া পদ্মার ঢেউ সরাসরি আঘাত হানছে ঐতিহ্যবাহী রায়টা-মহিষকুণ্ডি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে। ঝুঁকিতে রয়েছে নদীভাঙনকবলিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভূরকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়াড় কান্দিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়াড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়াড় মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও জুনিয়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
একই সঙ্গে হাটখোলাপাড়া জামে মসজিদ, জুনিয়াদহ বাজার এবং ভূরকা, কোলদিয়াড়, জুনিয়াদহ ও কোলদিয়াড় পূর্বপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষ রয়েছেন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে।
মরিচা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বলেন, ‘পদ্মা এখন আর শুধু ফসলের মাঠে নেই। নদী একেবারে বাঁধের নিচে চলে এসেছে। এখনই জরুরি ব্যবস্থা না নিলে বিস্তীর্ণ এলাকা ও শত শত ঘরবাড়ি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।’
জরুরি ব্যবস্থা চায় পাউবো
সাম্প্রতিক ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত জমির সুনির্দিষ্ট পরিমাণের তথ্য এখনও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে নেই। তবে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ চলছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুর ইসলাম বলেন, পাউবোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সম্প্রতি ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ভাঙন ঠেকাতে জরুরি আপৎকালীন কাজের পাশাপাশি ভবিষ্যতে নদীর গতিপথ স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাক্কলন তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনিক অনুমোদন ও বাজেট পাওয়া গেলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভাঙন দেখতে গিয়ে সচিবকে ফোন এমপির
পদ্মার ভাঙনের ভয়াবহতার খবর পেয়ে শনিবার বেলা ১১টার দিকে নদীতীরবর্তী এলাকা পরিদর্শনে যান কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা। এ সময় ভূরকা, কোলদিয়াড়সহ নদীপারের শত শত মানুষ তাঁর কাছে তাঁদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন।
পরিদর্শনকালে সংসদ সদস্য সরাসরি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তিনি ভাঙনের ভয়াবহতা তুলে ধরে দ্রুত আপৎকালীন ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান। পাশাপাশি সাময়িকভাবে জিও ব্যাগ ও টিউব ফেলার জন্য বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানান।
রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, দৌলতপুরে পদ্মার ভাঙন রোধে স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রস্তাবনা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। বর্তমান জরুরি পরিস্থিতিতে আড়াই থেকে তিন কোটি টাকার বাজেট চাওয়া হয়েছে। টেকসই নদীশাসনের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরা হচ্ছে।
তবে নদীপাড়ের মানুষের কাছে এখন প্রতিশ্রুতির চেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে কার্যকর পদক্ষেপ। কারণ পদ্মার ভাঙন থেমে নেই। প্রতিদিনই নদীর বুক আরও একটু চওড়া হচ্ছে, আর তীরের মানুষ হারাচ্ছেন তাঁদের শেষ সম্বল। কৃষকের ফসলি জমি থেকে শুরু করে বসতভিটা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো—সবকিছুই যেন এখন পদ্মার অনিশ্চিত গ্রাসের সামনে।
নদীপাড়ের মানুষের একটাই প্রশ্ন—ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে আর কতটা জমি, কতগুলো ঘরবাড়ি এবং কতটি পরিবারকে সর্বস্বান্ত হতে হবে?
| ফজর | ৫.২১ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৩.৪৭ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৫.২৬ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৬.৪৪ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১২.৩০ মিনিট দুপুর |