কুষ্টিয়া প্রতিনিধি | মো. মুনজুরুল ইসলাম
মাত্র এক কিলোমিটার। দূরত্বের হিসাবে খুব বেশি নয়। কিন্তু এই এক কিলোমিটার পথই বছরের পর বছর ধরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার পিয়ারপুর ইউনিয়নের কামালপুর ও কাজিপুর গ্রামের মানুষের কাছে যেন এক দীর্ঘ দুর্ভোগের নাম। বর্ষায় কাদা, শুষ্ক মৌসুমে ধুলা আর খানাখন্দ—ঋতু বদলায়, দুর্ভোগ বদলায় না। বদলায় শুধু ভোগান্তির ধরন।
কামালপুর গ্রামের শেষ সীমানা থেকে আনসার-মিলিটারি জমির আল ঘেঁষে কাজিপুর গ্রামের মিজান মোড় পর্যন্ত জিগে তোলা মাঠের ভেতর দিয়ে যাওয়া এই কাঁচা সড়কটি স্থানীয়দের কাছে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ হলেও বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছে অবহেলায়। সড়কটি পাকা না হওয়ায় কয়েকটি গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন ও জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে স্থায়ী সংকট।
বর্ষায় সড়ক নয়, যেন কাদার ফাঁদ
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষা শুরু হলেই সড়কটির প্রকৃত চিত্র সামনে আসে। সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন স্থানে কাদা জমে যায়। কোথাও তৈরি হয় গভীর গর্ত, কোথাও আবার পানি ও কাদায় রাস্তার অস্তিত্বই বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। পিচ্ছিল পথে হেঁটে চলাই কঠিন; ভ্যান, ইজিবাইক ও মোটরসাইকেল চালকদেরও ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়।
ফলে এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে কখনো কখনো স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সময় লাগে। জরুরি প্রয়োজনে রোগী নিয়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ভোগান্তি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে, বিপাকে শিক্ষার্থীরাও
এই সড়ক শুধু মানুষের চলাচলের পথ নয়, এটি স্থানীয় কৃষকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। মাঠ থেকে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়ার ক্ষেত্রে সড়কটির বেহাল অবস্থার কারণে কৃষকদের অতিরিক্ত সময় ও পরিবহন ব্যয় গুনতে হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
কৃষিপ্রধান এই এলাকায় সড়কটি চলাচল উপযোগী না থাকায় কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। এতে একদিকে পরিবহন খরচ বাড়ে, অন্যদিকে পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রেও তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।
শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগও কম নয়। বর্ষাকালে কাদা মাড়িয়ে তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। অনেক সময় পোশাক নোংরা হওয়ার আশঙ্কায় কিংবা চলাচলের অনুপযোগী রাস্তার কারণে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়।
বছরের পর বছর দাবি, তবু কার্যকর উদ্যোগ কোথায়?
স্থানীয় বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোগ সড়ক দীর্ঘদিনেও কেন উন্নয়নের আওতায় এলো না?
তাদের অভিযোগ, সড়কটি সংস্কার ও পাকাকরণের দাবি নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জানানো হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে প্রতিবার বর্ষা এলেই নতুন করে শুরু হয় দুর্ভোগের গল্প।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, যেখানে মাত্র এক কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন করলেই কয়েকটি গ্রামের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে, সেখানে সেই কাজটি বছরের পর বছর ঝুলে থাকার কারণ কী? সড়কটি উন্নয়নের জন্য কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে তার বর্তমান অবস্থা কী—এসব প্রশ্নেরও জবাব চান তারা।
উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
গ্রামবাংলার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নকে বরাবরই অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হলেও কামালপুর–কাজিপুরের এই সংযোগপথ যেন সেই উন্নয়নের চিত্রের সঙ্গে একেবারেই বেমানান। মাত্র এক কিলোমিটার রাস্তার বেহাল দশা শুধু একটি সড়কের সমস্যা নয়; এটি স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা, নজরদারি ও জনদুর্ভোগ নিরসনে সংশ্লিষ্টদের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সড়কটি পাকা হলে কামালপুর ও কাজিপুরের পাশাপাশি গাজীপুরসহ আশপাশের এলাকার মানুষের যোগাযোগ অনেক সহজ হবে। কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে আসবে স্বস্তি।
দায় নেবে কে?
এক কিলোমিটার সড়ক। অথচ সেই পথকে ঘিরেই বছরের পর বছর মানুষের দুর্ভোগ। বর্ষায় কাদা, শুষ্ক মৌসুমে ধুলা—প্রতিদিনের এই ভোগান্তি যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একটি জনপদের মানুষের দুর্ভোগ কি এভাবেই স্বাভাবিক হয়ে থাকবে?
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সড়কটি সরেজমিন পরিদর্শন করে এর বাস্তব অবস্থা নিরূপণ করতে হবে। একই সঙ্গে সড়কটির মালিকানা, উন্নয়ন-দায়িত্ব ও সম্ভাব্য প্রকল্পের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট অবস্থান জানাতে হবে। প্রয়োজনে দ্রুত সংস্কারের পাশাপাশি স্থায়ীভাবে পাকাকরণের উদ্যোগ নিতে হবে।
কারণ, কামালপুর–কাজিপুরের মানুষের কাছে এটি শুধু একটি রাস্তা নয়—এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা এই এক কিলোমিটার সড়ক এখন যেন একটি প্রশ্নের প্রতীক—উন্নয়নের এত আয়োজনের মধ্যেও এই সামান্য পথটির দিকে কি কেউ ফিরেও তাকাবে না?
| ফজর | ৫.২১ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৩.৪৭ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৫.২৬ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৬.৪৪ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১২.৩০ মিনিট দুপুর |