| বঙ্গাব্দ
ad728
ad728

কুষ্টিয়ায় ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৫তম তিরোধান দিবসে দর্শনার্থীর উপচে পড়া ভিড়, ভাব-জগতের গানে মুখরিত ছেঁউড়িয়া আখড়া

রিপোর্টারের নামঃ MD MUNZURUL ISLAM
  • আপডেট টাইম : 18-10-2025 ইং
  • 135709 বার পঠিত
কুষ্টিয়ায় ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৫তম তিরোধান দিবসে দর্শনার্থীর উপচে পড়া ভিড়, ভাব-জগতের গানে মুখরিত ছেঁউড়িয়া আখড়া
ছবির ক্যাপশন: কুষ্টিয়ায় ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৫তম তিরোধান দিবসে দর্শনার্থীর উপচে পড়া ভিড়, ভাব-জগতের গানে মুখরিত ছেঁউড়িয়া আখড়া

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: মো. মুনজুরুল ইসলাম

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৫তম তিরোধান দিবসে লাখো দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে আখড়াবাড়ি পরিণত হয়েছে জনসমুদ্রে। শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) রাতে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের প্রথম দিনেই দর্শনার্থীর উপচে পড়া ভিড়ে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। একতারা, দোতারা, ঢোল ও বাঁশির সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো লালনভূমি ছেঁউড়িয়া।

দাওয়াত বা নিমন্ত্রণ ছাড়াই দেশের নানা প্রান্ত থেকে সাধু-গুরু, বাউল-বাউলানি ও সাধারণ মানুষ ভিড় জমিয়েছে মরা কালী নদীর তীরে লালন মঞ্চে। শহর থেকে মাত্র ১০ মিনিটের পথ হলেও যানজটে সেখানে পৌঁছাতে সময় লাগছে ঘণ্টারও বেশি।

এবার প্রথমবারের মতো সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতায় ও লালন একাডেমির আয়োজনে জাতীয় পর্যায়ে তিরোধান দিবস উদযাপিত হচ্ছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী (ভিডিও বার্তায় যুক্ত ছিলেন)। বিশেষ অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এবং সংস্কৃতি সচিব মো. মফিদুর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন।

মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক ও গবেষক প্রফেসর গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন।

প্রধান অতিথি মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘লালনকে নানাভাবে চিন্তা, ভাবনা ও আবিষ্কার করা যেতে পারে—এটাই তাঁর সৌন্দর্য। এবারই প্রথম জাতীয় পর্যায়ে লালন উৎসব উদযাপিত হচ্ছে, যা মানবতার বাণীকে ছড়িয়ে দেবে দেশের সর্বত্র।’

বিশেষ অতিথি ফরিদা আখতার বলেন, ‘ফকির লালন ছিলেন মানবতার জয়গানের সাধক। প্রাণের টানেই মানুষ ছুটে আসে লালন আখড়ায়। তাঁর দর্শন আজও আমাদের চেতনায় নতুন প্রাণ সঞ্চার করে।’

সংস্কৃতি সচিব মো. মফিদুর রহমান বলেন, ‘লালন ছিলেন সত্যসন্ধানী মানুষপ্রেমিক। মানুষে মানুষে ভালোবাসা ও সমতার যে আদর্শ তিনি রেখে গেছেন, সেটিই আজকের সমাজে সবচেয়ে প্রয়োজনীয়।’

মুখ্য আলোচক প্রফেসর গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক বলেন, ‘ফকির লালন সাঁইয়ের গানে মানবতার সারবত্তা নিহিত। তাঁর গান কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়ের সীমায় আবদ্ধ নয়। তিনি মানুষকে ভালোবাসার ধর্মে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন। তাই আগে পথ ঠিক করো, তারপর মত।’

অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট চিন্তক ফরহাদ মজহার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আল মামুনসহ দেশবরেণ্য গবেষক ও সাহিত্যিকরা বক্তব্য রাখেন। সভার আগে উন্মুক্ত মঞ্চে ফকির লালনের জীবনী ও দর্শন নিয়ে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।

আলোচনার পর শুরু হয় মূল গানের আসর। উদ্বোধনী সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় লালন গানের পর্ব, যা রাতভর চলে। একতারা, দোতারা, ঢোল ও বাঁশির সুরে মেতে ওঠে হাজারো দর্শক-শ্রোতা। ‘জাত গেল জাত গেল বলে’, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’, ‘মিলন হবে কত দিনে’, ‘দেখা দিও ওহে রাসুল’—এমন সব গানে পিনপতন নীরবতায় ভাসে লালনভূমি।

মরা কালিগঙ্গা নদীর পাড়ে বসেছে পাঁচ দিনের গ্রামীণ মেলা। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা হস্তশিল্প, বাদ্যযন্ত্র, গ্রামীণ সামগ্রী ও নানা ঐতিহ্যবাহী পণ্য নিয়ে বসেছেন পসরা সাজিয়ে। পাশাপাশি আখড়াবাড়ির চারপাশে বসেছে সাধু-বাউলদের খণ্ড খণ্ড গানের আসর, যা উৎসবকে দিয়েছে বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যের অনন্য মাত্রা।

১৮৯০ সালের ১লা কার্তিক (১৭ অক্টোবর) ফকির লালন শাহ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে সমাহিত করা হয় পালক মা মতিজান ফকিরানীর পাশে। পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালে এ স্থানকে ঘিরে গড়ে ওঠে নয়নাভিরাম লালন মাজার, যা আজ লাখো ভক্ত-অনুরাগীর মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

ফকির লালন শাহের ভাব-জগতের গানে মিশে আছে মানবতা, প্রেম ও আত্মজ্ঞানের সাধনা। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে তাঁর গান মানুষের অন্তর ছুঁয়ে আসছে। আজও সেই মানবতার মরমি সুরে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া মুখরিত হয়ে ওঠে প্রতি বছরের মতো এবারও—ফকির লালনের তিরোধান দিবসে।

ছেঁউড়িয়ার বাতাসে আজও ভেসে বেড়ায় তাঁর সেই অমর বাণী— “মানুষ ভজলে  সোনার মানুষ হবি।” 

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ad728
ad728
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ আলোর পথ | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় অনুপম