কুষ্টিয়া প্রতিনিধি | মো. মুনজুরুল ইসলাম
একসময় ড্রাগন ফল ছিল এ দেশের মানুষের কাছে অনেকটাই অপরিচিত। বিদেশি ফল হিসেবেই যার সঙ্গে পরিচয় ছিল সাধারণ মানুষের। সেই ড্রাগন ফল এখন কুষ্টিয়ার মাটিতে হয়ে উঠেছে সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে সবুজের বুক চিরে সারি সারি খুঁটির ওপর বেড়ে ওঠা ড্রাগন গাছ আর তাতে ঝুলে থাকা লাল-গোলাপি ফল যেন কৃষকের নতুন স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। কোনো কোনো বাগানে ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে গাছের ডাল। বাগানে ঢুকলেই চোখে পড়ে রঙের উৎসব, আর সেই উৎসবের আড়ালেই লেখা হচ্ছে কৃষকের ভাগ্য বদলের গল্প।
কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন ফলের চাষ করে ইতোমধ্যে সাফল্যের মুখ দেখছেন অনেক কৃষক ও তরুণ উদ্যোক্তা। প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি বিকল্প ও লাভজনক কৃষি উদ্যোগ হিসেবে ড্রাগন চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন নতুন নতুন কৃষক। সফল চাষিদের বাগান দেখে উৎসাহিত হচ্ছেন অন্যরাও। ফলে জেলার কৃষিতে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে সম্ভাবনাময় এই বিদেশি ফল।
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ড্রাগন চাষে শুরুতে নানা ধরনের সংশয় থাকলেও ফলন পাওয়ার পর বদলে গেছে তাঁদের ধারণা। পরিকল্পিতভাবে বাগান তৈরি, সঠিক পরিচর্যা, সার ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে একই গাছ থেকে কয়েক বছর ধরে ফলন পাওয়া যায়। ফলে একবার বাগান প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়ের পথও প্রশস্ত হয়।
কৃষকের কাছে ড্রাগন বাগান এখন শুধু একটি ফলের ক্ষেত নয়—এ যেন ভবিষ্যৎ বদলের এক সবুজ বিনিয়োগ। কেউ নিজের জমিতে, আবার কেউ লিজ নেওয়া জমিতে গড়ে তুলেছেন ড্রাগনের বাগান। বিশেষ করে শিক্ষিত ও কর্মপ্রত্যাশী তরুণদের একটি অংশ চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকে উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। তাঁদের হাত ধরে কৃষি এখন অনেকের কাছে শুধু জীবিকা নয়, হয়ে উঠছে সম্ভাবনাময় ব্যবসা।
ড্রাগন বাগানের সফলতার গল্প ছড়িয়ে পড়ছে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায়। আগ্রহী কৃষকেরা ছুটে যাচ্ছেন সফল উদ্যোক্তাদের বাগানে। দেখছেন চাষপদ্ধতি, জানছেন পরিচর্যার কৌশল, হিসাব করছেন খরচ ও সম্ভাব্য লাভের। কেউ কেউ আবার ছোট পরিসরে শুরু করে ধীরে ধীরে বাগানের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া ড্রাগন ফল চাষের জন্য অনেকাংশেই উপযোগী। উঁচু জমি, পর্যাপ্ত রোদ এবং ভালো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকলে এ ফলের চাষ ভালো করা সম্ভব। তবে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন চাষ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত জাতের চারা নির্বাচন, মাটি প্রস্তুত, সার ব্যবস্থাপনা, সেচ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং ফল সংগ্রহ—প্রতিটি ধাপেই আধুনিক কৃষি জ্ঞান প্রয়োজন।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জও। ড্রাগন ফলের উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠছে। কোনো কোনো এলাকায় একই সময়ে অতিরিক্ত ফল বাজারে উঠলে দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নতুন উদ্যোক্তাদের শুধু বাগান করলেই হবে না; উৎপাদন খরচ, বাজার চাহিদা, সংরক্ষণব্যবস্থা ও বিপণন কৌশল নিয়েও আগাম পরিকল্পনা করতে হবে।
কৃষকদের মতে, ড্রাগন ফলের বাজার আরও বিস্তৃত করা গেলে এ চাষে যুক্ত মানুষের সংখ্যা বাড়বে। একই সঙ্গে ফলের পাশাপাশি চারা উৎপাদন, বাগান পরিচর্যা, শ্রমিকের কর্মসংস্থান, প্যাকেজিং ও পরিবহন খাতেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উন্নত বিপণনব্যবস্থা গড়ে উঠলে কৃষকরা আরও ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
কুষ্টিয়ার কৃষি অর্থনীতিতে ড্রাগন চাষ তাই ধীরে ধীরে নতুন এক সম্ভাবনার নাম হয়ে উঠছে। লাল-গোলাপি ফলের রঙে শুধু বাগানই রাঙছে না, রাঙছে কৃষকের স্বপ্নও। পরিকল্পিত উদ্যোগ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে ড্রাগন ফলের এই সম্ভাবনা আরও বহুদূর এগিয়ে যেতে পারে।
কুষ্টিয়ার মাটিতে ড্রাগনের বাগান এখন যেন এক নতুন গল্পের নাম—যে গল্পে আছে পরিশ্রম, আছে স্বপ্ন, আছে সাফল্যের হাসি। কৃষকের সেই হাসি বলে দেয়, সময়ের সঙ্গে কৃষিও বদলাচ্ছে। আর সেই বদলে যাওয়া কৃষির রঙিন ক্যানভাসে ড্রাগন ফল হয়ে উঠছে নতুন আশার প্রতীক।
| ফজর | ৫.২১ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৩.৪৭ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৫.২৬ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৬.৪৪ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১২.৩০ মিনিট দুপুর |