কুষ্টিয়া প্রতিনিধি | মো. মুনজুরুল ইসলাম
কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার খাজানগর—দেশের অন্যতম বৃহৎ চাল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা। এখানে গড়ে ওঠা প্রায় ৪০০ অটো ও হাসকিং রাইস মিল একদিকে জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, অন্যদিকে এসব মিলের কালো ধোঁয়া, উড়ন্ত ছাই ও অপরিশোধিত বর্জ্যে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে আশপাশের জনজীবন। ঘরের উঠান থেকে খাবারের টেবিল—সবখানেই ছাইয়ের আস্তরণ। বাতাসে মিশে থাকা ধোঁয়া ও দূষিত কণায় শ্বাসকষ্ট, কাশি, চোখ জ্বালাপোড়া ও নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একই সঙ্গে দূষিত বর্জ্যে হুমকির মুখে পড়েছে কৃষি ও জেলার গুরুত্বপূর্ণ সেচব্যবস্থা জিকে ক্যানেল।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এ পরিস্থিতিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর তদারকির ঘাটতি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নজরদারির অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। অবশেষে জনভোগান্তি ও পরিবেশদূষণের অভিযোগ আমলে নিয়ে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে গঠন করা হয়েছে ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি। বুধবার সকালে কমিটির সদস্যরা খাজানগর এলাকার পাঁচটি রাইস মিল পরিদর্শন করে দূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র পর্যবেক্ষণ করেন।
পরিদর্শনকালে কমিটির সদস্যরা সনি এগ্রো ফুড, জাহিদ অটো রাইস মিল, শামীম এগ্রো ফুড প্রোডাক্টস, মা-বাবার দোয়া ও সাজিম রাইস মিল ঘুরে দেখেন। এ সময় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বর্জ্য পানি নিষ্কাশনের আধুনিক ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টি উঠে আসে। অভিযোগ রয়েছে, অপরিশোধিত বর্জ্য পানি সরাসরি খাল ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ছে। পাশাপাশি সনি এগ্রো ফুড ও জাহিদ অটো রাইস মিলে ছাই নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির ঘাটতিও দেখতে পান তদন্ত কমিটির সদস্যরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মিলের চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ছাইয়ে খাজানগরের বাতাস ভারী হয়ে থাকে। সামান্য বাতাস উঠলেই ছাই উড়ে এসে ঢুকে পড়ে মানুষের ঘরবাড়িতে। খাবারের প্লেট, টেবিল, উঠান কিংবা শোবার ঘর—কোথাও যেন রেহাই নেই। ফলে প্রতিনিয়ত দূষিত পরিবেশের সঙ্গে বসবাস করতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।
খাজানগরের বাসিন্দা নুর ইসলাম ব্যাপারী বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে এই দূষণের মধ্যে বসবাস করছি। শিশু থেকে বৃদ্ধ—অনেকেই শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, কাশি, চোখে জ্বালাপোড়া ও চুলকানিসহ নানা সমস্যায় ভুগছেন। ঘরের আসবাব, কাপড়চোপড় ও খাবার পর্যন্ত ছাইয়ে ঢেকে যায়। বহুবার অভিযোগ জানিয়েও কার্যকর সমাধান পাইনি।”
স্থানীয়দের দাবি, শুধু পরিদর্শন নয়—দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিটি রাইস মিলে বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন, বর্জ্য পানি পরিশোধনের পর নিষ্কাশন, ছাই নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন বলেন, “আমরাও দূষণমুক্ত খাজানগর চাই। শিল্পের কার্যক্রম সচল রাখার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দূর করাও জরুরি। এ বিষয়ে মিল মালিকদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
তদন্ত কমিটির সদস্য জেলা পাউবোর সহকারী পরিচালক (ভূমি ও রাজস্ব) আমিনুল ইসলাম বলেন, “পরিদর্শনে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির সিদ্ধান্ত ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এমদাদুল হক বলেন, “যেসব রাইস মিলে পরিবেশ সুরক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই, তাদের সংশোধনের জন্য যৌক্তিক সময় দেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশোধন না হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আল্-ওয়াজিউর রহমান বলেন, “পরিদর্শনে ছাই ব্যবস্থাপনা, তরল বর্জ্য নিষ্কাশন ও সড়কের অপব্যবহারসহ বেশ কিছু অনিয়ম নজরে এসেছে। সংশ্লিষ্ট মিল মালিকদের মৌখিকভাবে বিষয়গুলো জানানো হয়েছে। শিগগিরই লিখিতভাবে জানানো হবে এবং সংশোধনের জন্য সময় দেওয়া হবে। নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা না নিলে সর্বোচ্চ আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তদন্ত কমিটির পরিদর্শন যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পাশাপাশি পরিবেশদূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এমনটাই প্রত্যাশা খাজানগরবাসীর। কারণ, শিল্পের বিকাশ যেমন জরুরি, তেমনি সেই শিল্পের ছায়ায় বসবাসকারী মানুষের নিরাপদ জীবন, নির্মল বাতাস ও সুস্থ পরিবেশের অধিকারও নিশ্চিত করা জরুরি।
| ফজর | ৫.২১ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৩.৪৭ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৫.২৬ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৬.৪৪ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১২.৩০ মিনিট দুপুর |