কুষ্টিয়া প্রতিনিধি | মো. মুনজুরুল ইসলাম
বর্ষার মেঘমাখা আকাশ। কখনো ঝুম বৃষ্টি, কখনো মিহি বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ। সেই বৃষ্টিকে সঙ্গী করে কুষ্টিয়ার বিস্তীর্ণ মাঠে এখন চলছে রোপা আমন ধানের চারা রোপণের উৎসব। কাদামাটিতে নেমে সারিবদ্ধভাবে সবুজ চারা রোপণ করছেন কৃষকেরা। কোথাও বীজতলা থেকে তোলা হচ্ছে চারা, কোথাও জমি সমান করতে ব্যস্ত কৃষক, আবার কোথাও কোমর পানিতে নেমে চলছে ধান রোপণের কাজ। বর্ষার সজীবতায় যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে কুষ্টিয়ার কৃষিজমি।
মৌসুমের শুরুতেই পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় আমন চাষের জন্য অনুকূল হয়ে উঠেছে জমি। ফলে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পুরোদমে শুরু হয়েছে রোপা আমনের চারা রোপণ। স্থানীয় জাতের পাশাপাশি উচ্চফলনশীল বিভিন্ন জাতের ধান আবাদে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন কৃষকেরা। তাঁদের প্রত্যাশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারও মাঠজুড়ে মিলবে কাঙ্ক্ষিত ফলন।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কুষ্টিয়া জেলায় প্রায় এক লাখ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের মধ্যে মানসম্মত বীজ ও সার প্রণোদনা হিসেবে বিতরণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
কুষ্টিয়ার মাঠে স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় স্বর্ণা-৫, রঞ্জিত ও কাটারিভোগসহ বিভিন্ন জাতের ধান চাষ করা হচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চফলনশীল বিনা-৭, বিনা-১৭, বিনা-২২, বিনা-২৬ এবং ব্রি ধান-৩৪, ব্রি ধান-৮৭, ব্রি ধান-৯০, ব্রি ধান-৯৩, ব্রি ধান-৯৪ ও ব্রি ধান-৯৫ জাতের ধানও আবাদ করছেন কৃষকেরা।
তবে সবুজ চারার হাসির আড়ালেও আছে কৃষকের হিসাব-নিকাশ ও দুশ্চিন্তা। সার, ডিজেল, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় আমন চাষে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে চারা সংগ্রহ, রোপণ, সেচ, সার ও কীটনাশক—প্রতিটি ধাপেই আগের তুলনায় বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
কৃষকদের ভাষ্য, উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে ধানের দাম সব সময় আশানুরূপ থাকে না। ফলে ভালো ফলন হলেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত লাভ ঘরে ওঠে না। তাই আমন মৌসুমে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি তাঁদের। ধানের দাম ন্যায্য থাকলে কৃষকের পরিশ্রম যেমন সার্থক হবে, তেমনি আগামী মৌসুমে চাষাবাদে তাঁদের আগ্রহও আরও বাড়বে।
কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, রোপা আমনকে ঘিরে কৃষকদের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে। কেউ পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি প্রস্তুত করছেন, কেউবা নিজেই মই টেনে জমি সমান করছেন। কোথাও বীজতলা থেকে যত্ন করে তোলা হচ্ছে আমনের চারা। আবার কোনো কোনো জমিতে সারিবদ্ধ হয়ে চারা রোপণ করছেন কৃষকেরা। বর্ষার পানিতে সিক্ত মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহে বদলে গেছে গ্রামের চিরচেনা দৃশ্য।
স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে খোকসা উপজেলায় ৬ হাজার ৭২৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কৃষকদের ব্যাপক আগ্রহের কারণে এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আমন আবাদ হতে পারে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। অধিক ফলনের আশায় স্থানীয় জাতের পাশাপাশি উচ্চফলনশীল বিভিন্ন জাতের ধানের চারা রোপণ করছেন কৃষকেরা। এসব জাতের মধ্যে রয়েছে স্বর্ণা-৫, গুটি স্বর্ণা, বিআর-১১, ব্রি ধান-৩৩, ব্রি ধান-৫১, ব্রি ধান-৫২ ও বিনা-৭সহ বিভিন্ন উফশী জাত।
খোকসার আমবাড়িয়া ইউনিয়নের আমবাড়িয়া গ্রামের কৃষক সাবু, মোতালেব ও কামরুলসহ কয়েকজন জানান, তাঁদের এলাকার জমিতে বছরে তিন ধরনের ফসল আবাদ হয়। পাট কাটার আগেই কোনো কোনো জমিতে পাটের মধ্য দিয়ে আমন ধানের বীজ বপন করা হয়েছে। আবার পাট কাটার পর অনেক জমিতে রোপণ করা হচ্ছে ধানের চারা। আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যেই তাঁদের এলাকার অধিকাংশ জমিতে চারা রোপণের কাজ শেষ হবে বলে জানান তাঁরা।
কৃষকেরা বলেন, এ বছর বৃষ্টিপাত সময়মতো হওয়ায় আমন চাষে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে সার ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। তাই আবহাওয়া অনুকূলে থেকে ভালো ফলন হলেও ধানের ন্যায্যমূল্য না পেলে তাঁদের লোকসানের আশঙ্কা থেকেই যাবে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আমনের ফলন বাড়াতে কৃষকদের আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। জমির উপযোগী জাত নির্বাচন, সুষম সার প্রয়োগ, সময়মতো আগাছা দমন এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে আমনের ভালো ফলন পাওয়ার আশা করছে কৃষি বিভাগ।
এদিকে রোপা আমনের চারা রোপণকে ঘিরে কুষ্টিয়ার গ্রামবাংলায় এখন ব্যস্ততার পাশাপাশি স্বপ্নেরও ঋতু চলছে। কৃষকের চোখ এখন আকাশের দিকে—সময়মতো বৃষ্টি হবে তো? আবহাওয়া অনুকূলে থাকবে তো? রোগবালাইয়ের আক্রমণ কম থাকবে তো?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে সময়ের সঙ্গে। তবে এখন কাদামাটির বুকে সারি সারি সবুজ চারা রোপণের দৃশ্যই বলে দিচ্ছে—কয়েক মাস পর এই মাঠগুলোই বদলে যেতে পারে সোনালি ধানের সমুদ্রে। সেই সোনালি ফসলের প্রত্যাশাতেই বুক বাঁধছেন কুষ্টিয়ার কৃষকেরা। তাঁদের সেই প্রত্যাশার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো কৃষক পরিবারের স্বস্তি, হাসি আর আগামী দিনের জীবনের স্বপ্ন।
| ফজর | ৫.২১ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৩.৪৭ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৫.২৬ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৬.৪৪ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১২.৩০ মিনিট দুপুর |