কুষ্টিয়া প্রতিনিধি : মো. মুনজুরুল ইসলাম
মাটির গন্ধে মিশে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, শ্রম আর শৈল্পিক চেতনা। সেই প্রাচীন ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করেই কুষ্টিয়ার কুমারপাড়ায় গড়ে উঠেছিল কেবি পটারি—একটি স্বপ্ন, একটি শিল্পচর্চা, একটি জীবন্ত ঐতিহ্য। কিন্তু সময়ের স্রোতে আজ সেই শিল্পই দাঁড়িয়ে আছে অস্তিত্ব সংকটে। অর্থাভাবে আধুনিক যন্ত্রপাতি কিনতে না পারায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে টিকে থাকার লড়াই।
কালের বিবর্তনে প্লাস্টিক, মেলামাইন ও অ্যালুমিনিয়ামের দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলার হাজার বছরের মৃৎশিল্প। তবুও আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কল্যাণপুর গ্রামের মৃৎশিল্পীরা। এখানকার কারিগরদের নিপুণ হাতে তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাটি, ফুলদানি ও নান্দনিক শোপিস আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এই সম্ভাবনার অন্যতম অংশীদার কেবি পটারি।
কেবি পটারির কারখানায় প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে হাতে ঘোরানো চাক, বহুদিনের পুরোনো ভাটা আর শ্রমিকদের নিরন্তর ঘামঝরা পরিশ্রম। প্রযুক্তির এই যুগে যখন আধুনিক মেশিনে দ্রুত ও নিখুঁতভাবে পণ্য উৎপাদন সম্ভব, তখন কেবি পটারি এখনো নির্ভর করছে প্রাচীন পদ্ধতির ওপর। এতে একদিকে যেমন সময় বেশি লাগছে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে—কমে যাচ্ছে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা।
প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী বটকৃষ্ণ পাল আক্ষেপ করে বলেন,“আধুনিক বৈদ্যুতিক চাক, উন্নত মানের কিলন (ভাটা) ও গ্লেজিং মেশিন থাকলে উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব হতো। সেই সাথে এই প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মচারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেত। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও আমাদের পণ্যের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু ব্যাংক ঋণ কিংবা সরকারি কোনো সহায়তা না পাওয়ায় সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারছি না।”
কারখানায় কর্মরত এক শ্রমিকের কণ্ঠেও হতাশার সুর—“আমরা কাজ জানি, মাটি আমাদের কথা বোঝে। কিন্তু যন্ত্রপাতি না থাকায় পরিশ্রমের ন্যায্য ফল পাই না। এজন্য অনেক তরুণ এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছে।”
স্থানীয় শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবি পটারির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু একটি ব্যবসা নয়—এগুলো গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ ধারক। যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ ও আধুনিক প্রশিক্ষণ পেলে এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মৃৎশিল্পের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হতে পারে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝেও হাল ছাড়েনি কেবি পটারি। প্রতিটি মৃৎপণ্যে এখনো ফুটে ওঠে শিল্পীর মনের মাধুর্য, নান্দনিকতা আর হাজার বছরের ঐতিহ্যের ছোঁয়া। তবে আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে এই শিল্প একদিন ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
এখনই সময়—সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার। নইলে মাটির সঙ্গেই মিশে যাবে এক জীবন্ত শিল্প-ইতিহাস।
| ফজর | ৫.২১ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৩.৪৭ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৫.২৬ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৬.৪৪ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১২.৩০ মিনিট দুপুর |