কুষ্টিয়া প্রতিনিধি | মো. মুনজুরুল ইসলাম
নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রত্যাশা আর আগামীর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি)। উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত নবীনবরণ অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আন্তর্জাতিক মানের ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষায় গবেষণা, প্রযুক্তি, আধুনিক অবকাঠামো ও বিশ্বমানের কারিকুলাম নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।
শনিবার (১ আগস্ট) ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আয়োজিত ‘ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম-২০২৬’-এ ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী এসব কথা বলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার কাজ করছে। শিক্ষা বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার। এর মাধ্যমে গবেষণা সম্প্রসারণ, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিশ্বমানের শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সুযোগ তৈরি হবে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ সারির প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মেধার কোনো ভিসা বা সীমানা লাগে না। সময়ের সঠিক ব্যবহার করে নিজেদের এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যেন তোমরাই আগামী দিনের বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দিতে পারো।’ দেশের বাইরে থাকা মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে এনে জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন’-এর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনূর রহমান। সকাল ১০টার দিকে ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রথম পর্বের অনুষ্ঠান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. মাহ্দী আমিন বলেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘ডিমান্ড-ড্রিভেন’ ও ‘আউটকাম বেসড এডুকেশন’ চালু করা। এর মাধ্যমে শিক্ষা, গবেষণা ও শিল্পখাতের মধ্যে বাস্তবমুখী সম্পর্ক গড়ে উঠবে।
তিনি বলেন, স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তিশালী ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ ও কো-অপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্থানীয় সমস্যা সমাধান ও সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্ব দিতে পারে।
বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরবি ভাষা শেখার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে। আরবি ভাষা শিক্ষায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে একটি আধুনিক ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও বিশ্ববিদ্যালয়টি নেতৃত্ব দিতে পারে।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল রূপান্তরের আওতায় আনা হবে। হল, হোস্টেল ও শ্রেণিকক্ষসহ ক্যাম্পাসের প্রতিটি স্থানে উচ্চগতির ইন্টারনেট ও ওয়াই-ফাই সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পারস্পরিক কানেক্টিভিটির আওতায় এনে ডিজিটাল ক্লাসরুম এবং পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হবে।
তিনি বলেন, রাজধানীর বাইরের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে আর ‘প্রান্তিক বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। দেশের প্রতিটি ক্যাম্পাসে সমমানের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে, যাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকরা নিজ ক্যাম্পাসে বসেই বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সংযুক্ত থাকতে পারেন।
ওরিয়েন্টেশন বক্তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল আওয়াল বলেন, তরুণ প্রজন্মই দেশ গঠনের মূল কারিগর। বাংলাদেশকে আধুনিক, মানবিক ও কর্মমুখী রাষ্ট্রে পরিণত করতে নবীনদের বড় স্বপ্ন দেখতে হবে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে।
ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন তরুণ প্রজন্মকে বাংলাদেশের ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, শিক্ষা খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, ক্যাম্পাস ডিজিটালাইজেশন এবং উচ্চশিক্ষায় সমতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনূর রহমান বলেন, ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ইসলামী শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ের লক্ষ্যেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।
উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বাউন্ডারি দীর্ঘদিন সংস্কার হয়নি। স্থায়ী স্টেডিয়াম নেই, সংযোগ সড়কের উন্নয়ন প্রয়োজন। আবার কয়েকটি বিভাগে মাত্র এক-দুজন শিক্ষক দিয়ে মাস্টার্স প্রোগ্রাম পরিচালনা করতে হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে ইউজিসি ও সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. তোজাম্মেল হোসেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. এমতাজ হোসেন, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. ইদ্রিস আলী, মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ উন্নয়ন ও বাণিজ্য সম্পর্ক অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আলম শাহ এবং ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল হক বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. বেগম রোকসানা মিলি, জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. বাবলী সাবিনা আজহার এবং ওরিয়েন্টেশন আয়োজনের দুই কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মিজানূর রহমান ও অধ্যাপক ড. মো. আলীনূর রহমান শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জুলাই শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। ফুলেল শুভেচ্ছায় অতিথি ও নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ করে নেওয়ার পাশাপাশি অতিথিদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মাননা স্মারক।
দুই পর্বে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে প্রথম পর্বে থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, কলা, সামাজিক বিজ্ঞান, আইন এবং ইসলামিক ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব অনুষদের নবীন শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। দ্বিতীয় পর্বে ব্যবসায় প্রশাসন, বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি এবং জীববিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
দিনব্যাপী আয়োজনের আরেক আকর্ষণ ছিল মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে কুষ্টিয়া লালন একাডেমি এবং ডলি মণ্ডল ও তাঁর দল সংগীত পরিবেশন করে নবীনদের মাতিয়ে তোলে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. মনজুর রহমান, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. রশিদুজ্জামান, টিএসসিসির পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. জাকির হোসেন এবং একই বিভাগের প্রভাষক রুকাইয়া আক্তার।
এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে প্রশাসন ভবনের নিচে শতাধিক স্কুলশিক্ষার্থীর হাতে গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ইউজিসি চেয়ারম্যান ও সদস্য, মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষসহ অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
নবীনদের বরণকে কেন্দ্র করে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ। নতুন মুখের উচ্ছ্বাস, স্বপ্ন আর প্রত্যাশায় মুখর হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। বক্তাদের বক্তব্যে উঠে আসে—শুধু সনদ অর্জন নয়, জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের যোগ্য করে তোলাই হবে নবীনদের মূল লক্ষ্য। সেই প্রত্যয়েই বর্ণাঢ্য এ আয়োজন যেন নতুন শিক্ষার্থীদের সামনে খুলে দিল সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত।
| ফজর | ৫.২১ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৩.৪৭ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৫.২৬ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৬.৪৪ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১২.৩০ মিনিট দুপুর |