কুষ্টিয়া প্রতিনিধি | মো. মুনজুরুল ইসলাম
রাষ্ট্রের আবাসন কর্মসূচির মূল লক্ষ্য—ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথার ওপর একটি নিরাপদ ছাদ। অথচ কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার শোমসপুর ইউনিয়নে রেললাইনের পাশে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছেন এমন কয়েকজন অসহায় নারী, যাদের দাবি—সরকারি ঘরের জন্য তারা বারবার আবেদন করেছেন; ছুটেছেন জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের ভাগ্যে জোটেনি একটি নিরাপদ আশ্রয়।
প্রশ্ন উঠেছে—তাহলে সরকারি আবাসনের সুবিধা পাওয়ার তালিকায় কারা আছেন, আর কারা বাদ পড়ছেন?
শোমসপুর ইউনিয়নের রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী এসব নারী অধিকাংশই বিধবা, ভূমিহীন ও অসহায়। জীবনের শেষ সম্বল বলতে রেললাইনের পাশে কোনোমতে টিকে থাকা একটি ঘর। মাথার ওপর অনিশ্চিত ছাদ, চারপাশে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ। ট্রেন চলাচলের শব্দে কেঁপে ওঠে বসতঘর, আর প্রতিটি দিন কাটে দুর্ঘটনার আশঙ্কা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে।
তাদের অভিযোগ, সরকারি আবাসন প্রকল্পের আওতায় একটি ঘরের জন্য তারা একাধিকবার আবেদন করেছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে গিয়েছেন। নিজেদের অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু আবেদন-নিবেদনের সেই দীর্ঘ পথ পেরিয়েও এখনো কোনো দৃশ্যমান ফল পাননি তারা।
লাইলী খাতুন ও তাঁর মা জাহিদা খাতুন দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চিত পরিবেশে বসবাস করছেন বলে জানান স্থানীয়রা। তাদের মতোই কমেলা খাতুন (৬৫), সন্ধ্যা রানী (৪৫) ও কাকলি (৩৭)-এর জীবনও রেললাইনের পাশের ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে আটকে আছে।
৬৫ বছর বয়সী কমেলা খাতুনের জীবনে নিরাপদ আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা এখন যেন এক দীর্ঘ অপেক্ষার নাম। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই নারী জানেন না, জীবনের শেষ সময়টুকু কোথায় নিরাপদে কাটাবেন। একটি সরকারি ঘরের আশায় তিনি বহুবার আবেদন-নিবেদন করেছেন বলে জানান।
সন্ধ্যা রানীর ভাষায়, ‘আমাদের নিজের জায়গা নেই। রেললাইনের পাশে থাকি। সব সময় ভয় লাগে। সরকারি ঘরের জন্য অনেকবার বলেছি। কিন্তু এখনো কোনো ব্যবস্থা হয়নি।’
কাকলির প্রশ্ন, ‘যাদের ঘর নেই, তাদের জন্য যদি সরকারি ঘর হয়, তাহলে আমরা কেন ঘর পাচ্ছি না?’
এ প্রশ্ন শুধু কাকলির নয়; শোমসপুরের রেললাইনের পাশে বসবাসকারী অসহায় পরিবারগুলোরও।
আবেদন যায়, ফল আসে না কেন?
সরকারি আবাসন প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের তালিকা প্রণয়ন, যাচাই-বাছাই এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শোমসপুর ইউনিয়নের এই নারীদের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—তাদের আবেদনগুলো কোথায় আটকে আছে? তারা কি সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন? হয়ে থাকলে ঘর পেলেন না কেন? আর তালিকায় না থাকলে কেন নেই?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন স্বচ্ছ যাচাই ও প্রশাসনিক তদন্ত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক অসহায় পরিবার সরকারি সহায়তার জন্য অপেক্ষা করলেও তারা যথাযথ প্রক্রিয়ায় সুবিধা পাচ্ছেন না। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
রেললাইনের পাশে জীবন, প্রতিদিনই আতঙ্ক
রেললাইনের পাশে বসবাস শুধু আবাসন সংকট নয়, এটি নিরাপত্তারও বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে নারী, শিশু ও প্রবীণদের জন্য এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাস কতটা নিরাপদ—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
দিনের আলোয় রেললাইনের পাশের এই বসতি হয়তো সাধারণ চোখে আর দশটি দরিদ্র মানুষের বসতির মতোই। কিন্তু রাত নামলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। ট্রেনের শব্দ, অন্ধকার আর অনিশ্চয়তার মধ্যে ঘুমাতে যান এসব মানুষ। কখনো ঝড়-বৃষ্টি, কখনো উচ্ছেদের আশঙ্কা—সব মিলিয়ে তাদের জীবন যেন স্থায়ী উদ্বেগের মধ্যে আটকে আছে।
অথচ তাদের দাবি খুব বেশি নয়। দামি বাড়ি নয়, শহুরে বিলাসিতা নয়—শুধু একটি নিরাপদ সরকারি ঘর।
তালিকা যাচাইয়ের দাবি
সচেতন নাগরিকদের মতে, শোমসপুর ইউনিয়নের রেললাইনের পাশে বসবাসকারী ভূমিহীন ও অসহায় পরিবারগুলোর বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরেজমিনে তদন্ত করা প্রয়োজন। সরকারি আবাসন প্রকল্পের তালিকায় তাদের নাম আছে কি না, আবেদনগুলো কোথায় জমা হয়েছে, কেন তারা এখনো ঘর পাননি—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা দরকার।
একই সঙ্গে প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের তালিকা প্রকাশ্যে যাচাইয়ের সুযোগ থাকলে অনিয়ম বা বৈষম্যের অভিযোগেরও অবসান হতে পারে।
অসহায় এসব নারীর আকুতি—‘আমাদের মাথার ওপর একটি নিরাপদ ছাদ দিন।’
রাষ্ট্রের আবাসন কর্মসূচির সাফল্য কেবল কতগুলো ঘর নির্মাণ হয়েছে, সেই সংখ্যায় নয়; বরং প্রকৃত গৃহহীন মানুষটির মাথার ওপর সেই ঘরটি পৌঁছেছে কি না—সাফল্যের আসল মাপকাঠি সেখানেই।
শোমসপুরের রেললাইনের পাশে বসবাসকারী এসব অসহায় নারী এখন সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছেন—সরকারি ঘরের জন্য বারবার আবেদন করেও তাঁদের অপেক্ষার শেষ হবে কবে?
তাদের জন্য একটি ঘর কি শুধুই প্রতিশ্রুতি, নাকি একদিন সত্যিই হবে নিরাপদ ঠিকানা?
| ফজর | ৫.২১ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৩.৪৭ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৫.২৬ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৬.৪৪ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১২.৩০ মিনিট দুপুর |