| বঙ্গাব্দ
ad728
ad728

কুষ্টিয়ার মাটির হাঁড়ি-পাতিল এখন বিদেশে—হারানো গৌরব ফিরে পাচ্ছে মৃৎশিল্প

রিপোর্টারের নামঃ MD MUNZURUL ISLAM
  • আপডেট টাইম : 20-11-2025 ইং
  • 66944 বার পঠিত
কুষ্টিয়ার মাটির হাঁড়ি-পাতিল এখন বিদেশে—হারানো গৌরব ফিরে পাচ্ছে মৃৎশিল্প
ছবির ক্যাপশন: কুষ্টিয়ার মাটির হাঁড়ি-পাতিল এখন বিদেশে—হারানো গৌরব ফিরে পাচ্ছে মৃৎশিল্প

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি : মো. মুনজুরুল ইসলাম

কালের বিবর্তনে প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের দখলে হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। তবু আশা জাগাচ্ছে কুষ্টিয়ার কুমারখালী। এখানকার কল্যাণপুর গ্রামের মৃৎশিল্পীরা আবারও বিশ্ববাজারে নিজেদের স্বকীয়তা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। দেশের সীমানা পেরিয়ে কুষ্টিয়ার মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাটি, ফুলদানিসহ নানা পণ্য এখন রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে।

ঐতিহ্যের ধারক-বাহক কল্যাণপুর মৃৎশিল্প

কুমারখালী উপজেলার কল্যাণপুর গ্রামে ৪০ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত ‘কল্যাণপুর মৃৎশিল্প সমবায় সমিতি’। এ গ্রামের বটোকৃষ্ণ পালের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা মৃৎশিল্প কারখানাটি আজ কুষ্টিয়ার অন্যতম রপ্তানিমুখী শিল্পকেন্দ্র। দুই একর জায়গাজুড়ে নির্মিত এই কারখানায় প্রতিদিন কাজ করেন ৫০–৬০ জন নারী-পুরুষ। কেউ কাদা তৈরি করেন, কেউ থালা-বাটি আকৃতি দেন, কেউ শুকানো পণ্য শান দেন।

সমবায়টির পরিচালক বটোকৃষ্ণ পাল জানান, “আমাদের তৈরি পণ্যের চাহিদা এখন দেশের চেয়ে বিদেশেই বেশি। কাতার, সৌদি আরব এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত পণ্য পাঠানো হয়। ঢাকার ব্যবসায়ী মফিজুল ইসলাম ও হাসানসহ কয়েকজন আমাদের পণ্য বিদেশে রপ্তানি করছেন।”

সংঘর্ষের মধ্যেও টিকে থাকার লড়াই

মৃৎশিল্পের শ্রমিকদের জীবনও মোটেই সহজ নয়।চৈতালি দাস নামের এক নারী শ্রমিক তিন বছর ধরে এখানে কাজ করছেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর ছোট মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে তিনি বাধ্য হয়েই এই পেশায় যোগ দেন।

“মাসে তিন হাজার টাকা পাই। তার এক তৃতীয়াংশ যাতায়াতে চলে যায়। তবুও কাজে মন দিই, কারণ এর ওপরই সংসার চলে,” বললেন তিনি।

আরেক শ্রমিক শিল্পী জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় অল্প বেতনে সংসার টেনে নেওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্লাস্টিকের ভিড়ে মাটির স্বাদ

মাটির তৈরি পণ্য কিনতে আসা আব্দুল লতিফ বলেন, “বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে মৃৎশিল্পের গভীর সম্পর্ক। আগে যেসব জিনিস ব্যবহার হতো, সেগুলো এখন আর দেখা যায় না। তাই মনে টান থেকে কিছু জিনিস কিনতে এসেছি।”

ব্যবহারিক দিক থেকে প্লাস্টিকের পণ্যে বাজার দখল করে নিলেও এখনো ঐতিহ্যবাহী রূপ-রস-গন্ধ ধরে রেখেছে মাটির শৈল্পিক তৈজসপত্র।

আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব—বড় বাধা

চাহিদা বাড়লেও উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে যন্ত্রপাতির ঘাটতি ও মূলধনের অভাব। বটোকৃষ্ণ পাল বলেন, “পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি না থাকায় চাহিদামতো পণ্য সরবরাহে হিমশিম খেতে হয়। বহুবার সরকারি দপ্তরে আবেদন করেও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাইনি।”

সরকারি উদ্যোগের আশ্বাস

কুষ্টিয়া জেলা সমবায় কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, “প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বাজার পরিবর্তনের কারণে মৃৎশিল্প কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। তবে কুষ্টিয়ার পণ্য আবারও নতুনভাবে সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। আমরা উন্নয়ন প্রকল্প ঢাকায় পাঠিয়েছি। অনুমোদন হলে মৃৎশিল্পের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।”

সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও বিশ্ববাজার—সবখানেই কুষ্টিয়া

মৃৎশিল্প কুষ্টিয়ার স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এখানকার মৃৎশিল্পীরা শুধু পণ্য তৈরি করেন না, তাঁরা রঙে-তুলিতে আঁকেন কুষ্টিয়ার শতবর্ষী ঐতিহ্য। রপ্তানির মাধ্যমে এই শিল্প এখন আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিচ্ছে।

বটোকৃষ্ণ পাল এবং তাঁর শ্রমিকদের নিরলস প্রচেষ্টা প্রমাণ করে, সঠিক সহায়তা পেলে কুষ্টিয়ার মৃৎশিল্প আবারও দেশ-বিদেশে বাঙালির পরিচয় উজ্জ্বল করে তুলতে সক্ষম হবে।

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ad728
ad728
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ আলোর পথ | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় অনুপম