কুষ্টিয়া প্রতিনিধি : মো. মুনজুরুল ইসলাম
ভোরের কুয়াশা ভেদ করে সূর্য ওঠার আগেই মাঠে নেমে পড়েন কৃষকরা। সবুজ ধানের শীষ কিংবা সোনালি গমের বদলে এখন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে চোখে পড়ছে সারি সারি তামাক গাছ। কৃষকের ঘামে ভেজা মাটি আর তামাক পাতার তীব্র গন্ধ মিলেমিশে বদলে দিচ্ছে গ্রামীণ চিরচেনা দৃশ্যপট।
বেশি লাভের আশায় ধান, গম, ভুট্টা কিংবা শাকসবজির চাষ কমিয়ে তামাকের দিকে ঝুঁকছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। কম সময়ে নগদ অর্থ পাওয়া, বাজার নিয়ে দুশ্চিন্তা না থাকা এবং তামাক কোম্পানিগুলোর আগাম সহায়তা—সব মিলিয়ে তামাক চাষ অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে ‘সহজ সমাধান’।
মিরপুর উপজেলার এক কৃষক বলেন,“ধান করলে খরচ বেশি, লাভ কম। কিন্তু তামাকে কোম্পানি বীজ-সার দেয়, শেষে ভালো টাকাও হাতে আসে। সংসার চালাতে বাধ্য হয়েই এই পথে আসছি।
ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, ঢাকা টোব্যাকো, জাপান টোব্যাকো, আবুল খায়ের টোব্যাকো, নাসির টোব্যাকো ও আকিজ টোব্যাকোসহ একাধিক কোম্পানি বীজ, সার ও অগ্রিম ঋণ দিয়ে কৃষকদের তামাক চাষে উৎসাহিত করছে। তামাক কেনার নিশ্চয়তা থাকায় কৃষকদের আলাদা করে বাজারে ছুটতে হয় না। অনেক এলাকায় গড়ে উঠেছে বড় বড় ক্রয়কেন্দ্র ও গোডাউন।
দৌলতপুর উপজেলার খলিসাকুন্ডি ইউনিয়নের কৃষকরা জানান, কোম্পানির সুপারভাইজাররা প্রতিদিন মাঠে এসে পরামর্শ দেন। অথচ বিকল্প ফসল চাষে এমন সক্রিয়তা খুব কমই দেখা যায়।
দৌলতপুর উপজেলার এক কৃষক বলেন,“তামাক চাষে প্রতি বিঘায় খরচ পড়ে ৪০–৫০ হাজার টাকা। তিন মাসে প্রতি বিঘা থেকে প্রায় এক লাখ টাকার তামাক বিক্রি হয়। লাভ থাকে ৫০–৬০ হাজার টাকা। তাই স্বাস্থ্যঝুঁকি জেনেও সবাই কাজ করছে।”
তার কথায় উঠে আসে আরেকটি নির্মম বাস্তবতা—“তামাকের সময় ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। নারী, বৃদ্ধ আর শিশুরাও মাঠে কাজ করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাক চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। তামাক শুকানোর জন্য জ্বালানি কাঠ ব্যবহারে বাড়ছে বন উজাড়ের ঝুঁকি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তৌহিদুল হাসান তুহিন বলেন,“তামাকের গুঁড়া বাতাসের সঙ্গে শ্বাসনালিতে ঢুকে ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করে। ব্রংকাইটিস, এজমা, টিবিসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু এই ক্ষতি সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় না।”
সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু-কিশোররা। বসতবাড়ির পাশে ও রাস্তার ধারে গড়ে ওঠা তামাক পোড়ানোর ঘর থেকে নির্গত ধোঁয়া তাদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠছে।
কৃষি বিভাগের চেষ্টা, কিন্তু চ্যালেঞ্জ বড়
কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. হায়াত মাহমুদ বলেন,“তামাক চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করতে আমরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছি। ধান, ভুট্টা, গম, আলু ও ফল চাষে পরামর্শ ও সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। কৃষকরা সচেতন হলে ধীরে ধীরে তামাক থেকে বেরিয়ে আসবেন।”
তবে বাস্তবতা হলো—তামাক কোম্পানির লোভনীয় সুবিধার কাছে অনেক ক্ষেত্রেই সেই উদ্যোগ কার্যকর হচ্ছে না।
সবুজ শস্যের বদলে তামাক পাতায় ঢেকে যাওয়া কুষ্টিয়ার মাঠ আজ নীরবে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে—স্বল্পমেয়াদি লাভের মোহে আমরা কি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছি না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন দুশ্চিন্তায় সচেতন মহল।
| ফজর | ৫.২১ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৩.৪৭ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৫.২৬ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৬.৪৪ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১২.৩০ মিনিট দুপুর |