কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: মো. মুনজুরুল ইসলাম
কুষ্টিয়া জেলাজুড়ে এ বছর সূর্যমুখী ফুলের মাঠ যেন নতুন স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। সোনালি রোদে ঝলমলে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সূর্যমুখী ফুল শুধু প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যই ছড়াচ্ছে না, বরং কৃষকের মনে জাগাচ্ছে বাম্পার ফলনের আশাবাদ।
জেলার সদর, ভেড়ামারা, মিরপুর ও কুমারখালীসহ বিভিন্ন উপজেলায় এবার তুলনামূলক বেশি জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগের প্রণোদনা, কারিগরি সহায়তা এবং সচেতনতামূলক উদ্যোগে ধাননির্ভর চাষাবাদ থেকে বেরিয়ে এসে অনেক কৃষক ঝুঁকছেন এই লাভজনক ফসলের দিকে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, সূর্যমুখী চাষে খরচ কম, পরিচর্যা সহজ এবং লাভের সম্ভাবনা বেশি। প্রতি বিঘা জমিতে মাত্র ৫-৬ হাজার টাকা ব্যয়ে আবাদ করা সম্ভব হলেও ভালো ফলন হলে ২০-২৫ হাজার টাকার বীজ বিক্রি করা যায়। পাশাপাশি সূর্যমুখীর খৈল পশু ও মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং শুকনো গাছ জ্বালানি হিসেবেও কাজে লাগে।
পদ্মা ও গড়াই নদীর চরাঞ্চল, যেখানে একসময় অনাবাদি বালুচর ছাড়া কিছুই চোখে পড়ত না, সেখানে এখন দিগন্তজোড়া হলুদ ফুলের সমারোহ। পদ্মা নদী তীরবর্তী এসব এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে—চাষিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন সূর্যমুখীর পরিচর্যায়। প্রতিটি ফুল এখন পরিপক্ব, আর কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হবে সংগ্রহ।
কৃষক আব্দুল করিম বলেন, “প্রথমবার সূর্যমুখী চাষ করেছি। মাঠজুড়ে এমন সৌন্দর্য আগে দেখিনি। ফলন ভালো হলে আগামী বছর আরও বেশি জমিতে চাষ করব।” একইভাবে শাহেদ আলী, সেলিম উদ্দিন ও খাইরুল ইসলামসহ অনেক কৃষক জানান, বেলে মাটিতে অন্য ফসলের তুলনায় সূর্যমুখীতে খরচ কম হলেও ফলন বেশি হয়।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, সূর্যমুখী চাষের জন্য সুনিষ্কাশিত বেলে-দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। রবি মৌসুমে (অগ্রহায়ণ থেকে পৌষ) বপন করা হলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। বর্তমানে দেশে বারি সূর্যমুখী-২, হাইসান-৩৩ (হাইব্রিড), ডিএস-১ এবং বারি সূর্যমুখী-৩ জাতের চাষ বেশি হচ্ছে। এর মধ্যে বারি সূর্যমুখী-২ জাতের বীজে তেলের পরিমাণ ৪২-৪৪ শতাংশ, যা ভোজ্যতেল হিসেবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
পুষ্টিবিদদের মতে, সূর্যমুখী তেল হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক এবং এতে কোলেস্টেরলের মাত্রা তুলনামূলক কম। বাজারে সয়াবিন তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত সূর্যমুখী তেলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। জেলার প্রায় ১৭০ হেক্টর জমিতে উৎপাদিত সূর্যমুখী স্থানীয় তেলের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. শওকত হোসেন ভূঁইয়া জানান, ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে কৃষকদের এই অর্থকরী ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিচ্ছেন।
সাহিত্যের ভাষায়, সূর্যমুখী চাষ যেন এক শুদ্ধ আরাধনা। মাটির গভীর মমতা আর কৃষকের শ্রমে জন্ম নেওয়া এই হলুদ ফুল সূর্যের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে থাকে—অটল, দৃঢ়, আশাবাদী। বাতাসে দোল খাওয়া সেই সোনালি ঢেউ যেন জানিয়ে দেয়—অন্ধকার পেরিয়ে আলোয় ফেরার গল্প।
আজ কুষ্টিয়ার মাঠে মাঠে ফুটে থাকা সূর্যমুখী কেবল একটি ফুল নয়; এটি সম্ভাবনার প্রতীক, কৃষকের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। এই সোনালি হাসি যদি ধরে রাখা যায়, তবে আগামী দিনে কুষ্টিয়া হয়ে উঠতে পারে দেশের সূর্যমুখী উৎপাদনের এক উজ্জ্বল কেন্দ্র।
| ফজর | ৫.২১ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৩.৪৭ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৫.২৬ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৬.৪৪ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১২.৩০ মিনিট দুপুর |