মধ্যরাতে বিদ্যুৎহীন জনপদ, ভুতুড়ে বিলের অভিযোগে দিশেহারা গ্রামবাসী
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি | মো. মুনজুরুল ইসলাম
ভ্যাপসা গরম। তার ওপর ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট। দিন-রাতের পার্থক্য যেন মুছে গেছে লোডশেডিংয়ের দাপটে। কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীনতা, আবার বিদ্যুৎ ফিরলেও স্থায়ী হচ্ছে না স্বস্তি। মধ্যরাতেও অন্ধকারে ডুবে থাকছে গ্রামের পর গ্রাম। ফলে কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকদের নিত্যদিনের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেক বেশি। দিনের ব্যস্ত সময় থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত কয়েক দফায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বিপাকে পড়ছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। তীব্র গরমে ঘরে থাকা দায় হয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ না থাকায় ছোট শিশুরা কান্নাকাটি করছে, পরিবারের সদস্যদের রাত কাটছে নির্ঘুম।
শুধু ঘুমের ব্যাঘাত নয়, বিদ্যুৎ সংকটে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা। ক্ষতির মুখে পড়ছে দোকানপাট, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ড। বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে অনেক পরিবারকে আইপিএস, চার্জার ফ্যান কিংবা জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে বাড়তি খরচ।
গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর কখন ফিরবে—এ বিষয়ে অনেক সময় নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। কোথাও বিদ্যুৎ আসার কিছুক্ষণ পরই আবার চলে যাচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা।
গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা বলছেন, দিনের লোডশেডিং কোনোভাবে সহ্য করা গেলেও রাতের পর রাত বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্ভোগ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তীব্র গরমে শিশুদের ঘুমাতে সমস্যা হচ্ছে। কয়েকজন অভিভাবকের দাবি, গরমের কারণে শিশুদের শরীরে চুলকানি ও বিভিন্ন ধরনের অস্বস্তিও দেখা দিচ্ছে।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিদ্যুৎ কখন থাকবে আর কখন থাকবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। দোকানে বসে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যবসা বন্ধ রাখতে হয়, অথচ মাস শেষে বিল ঠিকই দিতে হয়।’
আরেক গ্রাহকের ভাষ্য, ‘গরমের মধ্যে ছোট শিশুকে নিয়ে খুব কষ্টে থাকতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকার কারণ জানতে চাইলে অনেক সময় স্পষ্ট কোনো উত্তর পাওয়া যায় না।
শুধু বিদ্যুৎ চলে যাওয়াই নয়, বিভিন্ন এলাকায় ভোল্টেজ ওঠানামার অভিযোগও রয়েছে। গ্রাহকদের আশঙ্কা, নিম্ন বা অতিরিক্ত ভোল্টেজের কারণে ফ্রিজ, টেলিভিশন, ফ্যান, পানির পাম্পসহ মূল্যবান বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কৃষিতেও এর প্রভাব পড়ছে। সেচনির্ভর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলে কৃষকদের বিকল্প ব্যবস্থায় সেচ দিতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে সময় ও উৎপাদন ব্যয়।
লোডশেডিংয়ের ভোগান্তির মধ্যেই বিদ্যুৎ বিল নিয়ে নতুন করে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে গ্রাহকদের মধ্যে। কয়েকজন গ্রাহকের অভিযোগ, প্রত্যাশিত সরবরাহ না পেলেও মাস শেষে তাদের হাতে আসছে অস্বাভাবিক বা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বিল। স্থানীয়দের কেউ কেউ এসব বিলকে ‘ভুতুড়ে বিল’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
এক গ্রামবাসীর অভিযোগ, ‘একদিকে প্রতিনিয়ত লোডশেডিং, অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল আমাদের আরও দিশেহারা করে দিয়েছে। বিদ্যুৎ ঠিকমতো না পেয়েও যদি মাস শেষে অস্বাভাবিক বিল দিতে হয়, তাহলে এই দুর্ভোগের দায় নেবে কে?’
গ্রাহকদের প্রশ্ন—বিদ্যুতের পর্যাপ্ত সরবরাহ না পেয়েও কেন তাদের অতিরিক্ত বিলের বোঝা বহন করতে হবে? বিল তৈরিতে ভুল, মিটার রিডিংয়ের অসঙ্গতি কিংবা অন্য কোনো কারণে অতিরিক্ত বিল হয়ে থাকলে তার দায় কার?
বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, অতিরিক্ত চাহিদা, উৎপাদন ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতা, বিতরণ লাইনের কারিগরি ত্রুটি কিংবা রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে বিভিন্ন এলাকায় সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট হতে পারে। ফলে প্রতিটি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পেছনে একই কারণ রয়েছে—এমনটি বলা যায় না।
তবে গ্রাহকদের প্রশ্ন, দীর্ঘস্থায়ী ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রকৃত কারণ কী? জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ঘাটতি, স্থানীয় বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, কারিগরি ত্রুটি, নাকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—কোন কারণে কুষ্টিয়ার গ্রামাঞ্চলে এত বেশি বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে, তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা চান তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো জরুরি। কোন এলাকায় কখন এবং কী কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে, সম্ভব হলে আগেই গ্রাহকদের জানাতে হবে। পাশাপাশি পুরোনো বিতরণ অবকাঠামো সংস্কার, লাইনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করে মেরামতের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দাবি, ‘ভুতুড়ে বিল’ বা অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগগুলো দ্রুত যাচাই করতে হবে। মিটার রিডিং ও বিল তৈরির প্রক্রিয়ায় কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধন করে অতিরিক্ত অর্থ সমন্বয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে স্থায়ী সমাধানে যেতে হবে।
গ্রাহকদের ভাষ্য, শুধু ‘সরবরাহ সংকট’ কিংবা ‘কারিগরি ত্রুটি’ বলে দায় এড়িয়ে গেলে সমস্যার সমাধান হবে না। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা কোথায়, কেন তা দীর্ঘদিনেও কাটছে না এবং অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগের সত্যতা কতটা—এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের সামনে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
কুষ্টিয়ার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, গরমের এই দুঃসহ সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক ও সহনীয় পর্যায়ে আনা হবে। একই সঙ্গে বিল-সংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে।
বিদ্যুৎ না পেয়েও যদি মাস শেষে ‘ভুতুড়ে বিলের’ বোঝা বইতে হয়—তবে এই দুর্ভোগের জবাব দেবে কে?
এই প্রশ্নের স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক উত্তরই এখন কুষ্টিয়ার বিদ্যুৎ গ্রাহকদের প্রত্যাশা।
| ফজর | ৫.২১ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৩.৪৭ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৫.২৬ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৬.৪৪ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১২.৩০ মিনিট দুপুর |